গত ২৬ জুন তারিখে কুড়িগ্রামের এক সম্মানিত শিক্ষককে থানা শিক্ষা কর্মকর্তা আরিফ আহমেদ যে চরম অপমান করেছেন, তার প্রতিবাদে যায় যায় দিন পত্রিকায় একটি নিবন্ধ ছাপা হয়। নিবন্ধটি লেখেন বিশিষ্ট শিক্ষক শাকিলা নাছরিন পাপিয়া। প্রাসঙ্গিকতা বিবেচনা করে নিবন্ধটি এখানে পুনরায় প্রকাশ করা হলো।
অপমানে জর্জরিত ওই শিক্ষক এ দেশের পুরো শিক্ষক সমাজের প্রতীক। আমাদের মূল্যবোধের অবক্ষয়ের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত ওই শিক্ষা কর্মকর্তা, যার মুখের বিষবান বাক্যে একজন শিক্ষক লজ্জায় অজ্ঞান হয়ে যান। এ দেশের প্রতিটি বিবেকবান শিক্ষিত সন্তানের উচিত তার শিক্ষকের মর্যাদা রক্ষার্থে ওই শিক্ষা কর্মকর্তাকে ধিক্কার জানানো এবং ভবিষ্যতে এ ধরনের ধৃষ্টতা ওই শিক্ষা কর্মকর্তাই নয়, কেউ যেন দেখানোর সাহস না পায়, সে ব্যবস্থা গ্রহণ করা।
শাকিলা নাছরিন পাপিয়া
গত ২৬ জুন যায়যায়দিন পত্রিকার প্রথম পাতায় দেখলাম ‘ধৃষ্টতা’ শিরোনামে সংবাদটি। যে কোনো বিবেকবান মানুষ সংবাদটি পড়ে হতবাক হতে বাধ্য। একজন শিক্ষকের সঙ্গে এমন আচরণ শুধু শিক্ষকদের জন্যই নয়, গোটা জাতির জন্য লজ্জাজনক।
যে শিক্ষা কর্মকর্তা সব শিক্ষককে মাথায় স্কার্ফ পরার নির্দেশ দিয়েছেন, তিনি কি সরকার কর্তৃক পোশাক ডিজাইনার বা নারী সমাজে পর্দাপ্রথা প্রচলনের দায়িত্ব পেয়েছেন? শিক্ষার উন্নয়নের কর্মকা- পরিচালনার দায়িত্ব থাকে শিক্ষা কর্মকর্তার হাতে। শিক্ষকদের পোশাক নিয়ে ভেবে ভেবে মাথার ঘাম পায়ে ফেলা তার জন্য নয়।
প্রাথমিক বিদ্যালয়ে বেশিরভাগ শিক্ষক মহিলা। ৬০ শতাংশ মহিলা শিক্ষক নিয়োগের উল্লেখ থাকলেও ক্ষেত্রবিশেষে তা ৮০ শতাংশ। শিক্ষা কর্মকর্তা পুরুষ হওয়ার কারণে তিনি তার কর্মপরিধির বাইরে পুরুষত্ব ফলাতে গিয়ে তার অধীনে যতো স্কুল আছে, সব স্কুলের মহিলা শিক্ষকের মাথায় স্কার্ফ পরার নির্দেশ জারি করেন।
বিবেকবান শিক্ষকরা শিক্ষা কর্মকর্তার অতীতের নানা দুর্নীতিতে মুখ বুজে থাকলেও এবার প্রতিবাদ জানান। মাথায় স্কার্ফ পরা সব ধর্মের জন্য প্রযোজ্য নয়। তাছাড়া মাথায় স্কার্ফ পরতেই হবে, সংবিধানে এমন কোনো নীতিমালা নেই। সুতরাং একজন শিক্ষা কর্মকর্তার এ দেশের সব শিক্ষকের মাথায় স্কার্ফ ওঠানোর মহান দায়িত্ব পালন করা আর সম্প্রতি ঘটে যাওয়া দেশের নানা স্থানে দোররা মারার ফতোয়া প্রদান করা কি সমান অপরাধ নয়?
এই শিক্ষা কর্মকর্তা কেবল স্কার্ফ পরার নির্দেশ দিয়েই ক্ষান্ত হননি। তিনি চারবার শ্রেষ্ঠ শিক্ষকের সম্মান অর্জনকারী একজন প্রধান শিক্ষককে ‘বেশ্যা’ বলে গালি দেয়ার মতো ধৃষ্টতা প্রদান করেছেন ভরা মজলিশে। সাংবাদিকদের বলেছেন, যতো পারেন আমার সম্পর্কে লিখুন। এতো দুঃসাহস তিনি কোথায় পান? কোথায় তার খুঁটির জোর?
অশিক্ষিত নিম্নবিত্তের মধ্যে কোনো একজন কারো দ্বারা আক্রান্ত হলে দলবদ্ধভাবে সবাই মিলে তা প্রতিহত করে। এ দেশে নবপ্রজন্মের খুব কমসংখ্যক মানুষই আছে যারা প্রাথমিক বিদ্যালয়ে যায়নি।
কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে পৌঁছানোর মতো সৌভাগ্য এ দেশে অনেকেরই হয় না। কিন্তু প্রাথমিক বিদ্যালয়ের আঙিনায় পা পড়েনি, এমন লোকের সংখ্যা খুবই কম। যে শিশুটি মা-বাবার হাত ধরে ছোট ছোট পায়ে প্রথম স্কুলে আসে, সে তার শিক্ষককে আস্তে আস্তে মা-বাবার চেয়েও আপন করে নেয়। শিক্ষক হলেন সেই গুরু যিনি চোখের মাঝে জ্ঞানের আলো জ্বালিয়ে অজ্ঞতার অন্ধকার থেকে মানুষকে মুক্ত করেন। আমরা যদি আমাদের অতীত ইতিহাস পর্যালোচনা করি তাহলে দেখবো অতীতের অত্যাচারী, পরাক্রমশালী রাজা-মহারাজারাও শিক্ষকের সঙ্গে কথা বলেছেন সম্ভ্রমের সঙ্গে। শিক্ষককে রেখেছেন সবচেয়ে মর্যাদাসম্পন্ন স্থানে। ফলে যুগ যুগ ধরে সম্মানের আসনটি একমাত্র শিক্ষকের জন্য বরাদ্দ থাকার কারণেই অভাব-অনটন-দারিদ্র্যের সঙ্গে যুদ্ধ করেও শিক্ষক সমাজ জাতিকে জ্ঞানের আলো বিতরণ করেছেন। অন্য পেশাজীবীরা তাদের অর্থনৈতিক অবস্থার পরিবর্তনে সংঘাত, আন্দোলন, সহিংসতার আশ্রয় নিলেও শিক্ষক সমাজের হাজারও বছরের অর্থনৈতিক দুরবস্থার অবসানে তেমন কোনো শক্ত আন্দোলন গড়ে ওঠেনি। এ দেশের লাখ লাখ প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকের হতে গড়া শিক্ষার্থীরা আজ নিজ নিজ জীবনে প্রতিষ্ঠিত। দেশের প্রধানমন্ত্রী থেকে শুরু করে গার্মেন্ট শ্রমিক পর্যন্ত প্রতিটি মানুষ প্রাথমিক বিদ্যালয়ে একটা সময়ে লেখাপড়া করেছেন। দলাদলি, হানাহানি, মারামারি কলেজ এবং বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে গিয়ে শুরু হয়। প্রাথমিক পর্যায়ে কোমলমতি প্রতিটি শিশু তার সবচেয়ে আপনজন হিসেবে মনে করে তার শিক্ষককে। তাদের ভালোবাসায় কোনো দ্বন্দ্ব বা বিভেদ থাকে না। সুতরাং বাল্যকালের সেই স্মৃতিসমৃদ্ধ প্রাথমিক বিদ্যালয়ের স্মৃতিকে হৃদয়ে ধারণ করে সমাজের উচ্চস্তরে অধিষ্ঠিত শিক্ষামন্ত্রী, শিক্ষা সচিব থেকে শুরু করে প্রত্যেক সাংবাদিকের উচিত অপমানে অজ্ঞান হয়ে যাওয়া ওই শিক্ষকের পাশে দাঁড়ানো, যাকে একজন দুর্নীতিপরায়ণ শিক্ষা কর্মকর্তা ‘বেশ্যা’ বলে অপমান করেছেন।
অপমানে জর্জরিত ওই শিক্ষক এ দেশের পুরো শিক্ষক সমাজের প্রতীক। আমাদের মূল্যবোধের অবক্ষয়ের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত ওই শিক্ষা কর্মকর্তা, যার মুখের বিষবান বাক্যে একজন শিক্ষক লজ্জায় অজ্ঞান হয়ে যান। এ দেশের প্রতিটি বিবেকবান শিক্ষিত সন্তানের উচিত তার শিক্ষকের মর্যাদা রক্ষার্থে ওই শিক্ষা কর্মকর্তাকে ধিক্কার জানানো এবং ভবিষ্যতে এ ধরনের ধৃষ্টতা ওই শিক্ষা কর্মকর্তাই নয়, কেউ যেন দেখানোর সাহস না পায়, সে ব্যবস্থা গ্রহণ করা।
একদিকে আমরা ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার স্বপ্ন দেখছি, অন্যদিকে দোররা মারার কাহিনী প্রায় প্রতিদিনই কোথাও না কোথাও ঘটছে। এবার এসেছে স্কার্ফ পরার ফতোয়া।
জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তার সামনেই যখন থানা শিক্ষা কর্মকর্তা একজন প্রধান শিক্ষককে এমন জঘন্য ভাষায় গালি দেয়ার মতো ধৃষ্টতা প্রদানের দৃষ্টান্ত রাখতে পারেন, তখন এ দেশে শিক্ষক সমাজ প্রশাসনের কাছে কতোটা অসহায়, তা সহজেই অনুমান করা যায়। দেশের স্বাধীনতা এবং সার্বভৌমত্ব রক্ষার জন্য যেমন সেনাবাহিনীর ওপর নির্ভর করতে হয়, তেমনি দেশে মানুষ তৈরির জন্য শিক্ষকের ওপর নির্ভর করতে হয়। সেই মানুষ তৈরির প্রথম পদক্ষেপ হলো প্রাথমিক স্তর। মানুষ সৃষ্টির এই স্তরেই যদি গলদ থাকে তাহলে পুরো প্রক্রিয়াই হবে ভ-ুল। বিশাল জনসংখ্যা অধ্যুষিত এ দেশের মানুষকে জ্ঞানের আলোয় উজ্জীবিত করে মানুষরূপে গড়ে তোলার জন্য পুরো দেশ শিক্ষকের ওপর নির্ভরশীল। শিক্ষক যদি পূর্ণ মর্যাদা নিয়ে সম্মানের সঙ্গে বাঁচতে না পারেÑ এ সমাজ, এ দেশ যদি শিক্ষককে তার যোগ্য মর্যাদা দিতে না পারে তাহলে জনসংখ্যায় দেশ ভরবে, সৃষ্টি হবে না মানুষ। টাকায় মেধা সৃষ্টি হবে, মননে মানুষ সৃষ্টি হবে না।
মূল্যবোধের অবক্ষয়ের এই যুগে দুর্নীতির বিষবৃক্ষ যখন ডালপালা বিস্তার করে মহীরুহে পরিণত হয়েছে, তখনো আমরা নীতি-আদর্শের প্রতীক হিসেবে শিক্ষককে জানি। সব হারিয়ে এই একটি স্থানে আমাদের বিশ্বাস এখনো অটুট। এটুকু যেন হারিয়ে না যায় দুর্নীতিবাজদের কল্যাণে। ফতোয়ার যে কালো হাত একটু একটু করে গ্রাস করছে সমাজকে, তা প্রতিহত করার এখনই সময়। পৃথিবীর প্রতিটি মানুষ তার সন্তানকে দেখতে চায় তার চেয়ে বড় স্থানে; কিন্তু একমাত্র শিক্ষকই দেখতে চায় তার শিক্ষার্থীকে তার চেয়ে উঁচু স্থানে। সুতরাং এই শিক্ষককে গালি দেয়ার দুঃসাহস যে লোক দেখালো তার অপরাধকে আজ যদি ছোট করে দেখা হয়, তার কর্মকান্ডের যদি সঠিক তদন্ত না হয় তাহলে ভবিষ্যতে এ ধরনের অপরাধ আরো বড় হয়ে দেখা দেবে। মামা-চাচার জোরে এ সমাজে যারা মানুষকে মানুষ হিসেবে গণ্য করে না, তাদের প্রতিহত করার এখনই সময়।
শাকিলা নাছরিন পাপিয়া: শিক্ষক ও কলাম লেখক।
সূত্রা: যায় যায় দিন ২ জুলাই, ২০০৯
Filed under: সাম্প্রতিক Tagged: | কর্মকর্তা, নিবন্ধ, প্রতিবাদ, প্রশাসন, শিক্ষক, শিক্ষকতা, শিক্ষা